শার্লক হোমস, ফেলুদা কিংবা ব্যোমকেশের মতো গল্পের গোয়েন্দারা কত সহজেই মিথ্যে কথা ধরে ফেলে, তাই না? কে মিথ্যে কথা বলছে তা ঐ লোকের অঙ্গভঙ্গি, কথা বলার ধরন, কণ্ঠস্বরের ওঠা-নামা এসব দেখেই বুঝে যায় গোয়েন্দা। কেমন হতো যদি তুমিও পারতে মিথ্যাবাদীকে হাতেনাতে ধরতে? চলো, আজ আমরা মিথ্যা শনাক্ত করা শিখব।
আগের পর্বে[১] আমরা অঙ্গভঙ্গি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা করেছিলাম। মিথ্যা শনাক্ত করার জন্য অঙ্গভঙ্গির সেই ধারণাগুলো কাজে লাগবে। আমরা দুই পর্বে মিথ্যে সনাক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। এই পর্বে আমরা শিখব মিথ্যুকরা মিথ্যে বলার সময় তাদের অঙ্গভঙ্গিতে কী কী পরিবর্তন আসে এবং সেগুলো বোঝার মাধ্যমে কীভাবে মিথ্যে শনাক্ত করা যায়। পরবর্তী পর্বে জানব মিথ্যুকের কথা বলার ধরন, শব্দচয়ন, প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় ইত্যাদি।
বইয়ের গোয়েন্দারা যত সহজে চট করে মিথ্যে কথা ধরে ফেলে, বাস্তবে মিথ্যে কথা ধরা তত সহজ নয়। বাস্তবে মিথ্যে ধরার জন্য আবেগ, হাত-পায়ের নড়াচড়া, আচরণ এমন অনেকগুলো দিকে খেয়াল দিতে হয়। তাই ভালো গোয়েন্দা হতে হলে ছোট ছোট বিষয়ের দিকে নজর রাখতে শিখতে হবে।
একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে মিথ্যা বলার সময় মিথ্যুকদের মধ্যে ৩টি লক্ষণ দেখা যায়:
১। আবেগিয় প্রতিক্রিয়া,
২। মানসিক চাপ,
৩। আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা।[২]
এগুলো নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
আবেগিয় প্রতিক্রিয়া:
মিথ্যে বলার সাথে অনুতাপ, ভয় ও উত্তেজনা - এই তিনটি আবেগ জড়িত। ধরো, কোনো দুর্নীতিবাজ নেতার ঘুষ খাওয়ার খবর পাওয়ায় এক অনুসন্ধানি সাংবাদিক বা গোয়েন্দা তার কাছে গিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল। এখন সেই নেতা সরাসরি তা অস্বীকার করতে পারে। কিন্তু সাংবাদিককে ধোঁকা দিচ্ছে এবং ঘুষ খাওয়া খারাপ এটা ভেবে সে অনুতপ্ত হতে পারে। অথবা সে ভয় পেতে পারে এটা ভেবে যে, সাংবাদিক তার মিথ্যে ধরে ফেলতে পারে ও তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আবার, সফলতার সাথে মিথ্যে বলে সাংবাদিককে বোকা বানাতে পারার আনন্দে সে উত্তেজিত হতে পারে।
এই অনুভুতিগুলো মিথ্যুকের আচরণকে নানাভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যেমন, অনুতপ্ত হলে মানুষ সাধারণত চোখে চোখ রাখতে চায় না, চোখ সরিয়ে নেয়। ভয় পেলে মানুষ বারবার চোখের পাতা ফেলে, নিজের চুল, কাপড়চোপড়, চেহারা ইত্যাদি স্পর্শ করে, কথা বলার সময় তোতলায়, একই কথা পুনরাবৃত্তি করে। অনুতাপ ও ভয়ের মতো নেতিবাচক আবেগের ফলে মানুষ কথা বলার সময় হাত-পা কম নাড়ায়, সরাসরি প্রশ্নকর্তার দিকে মুখ করে বসে না। আবার, উত্তেজিত হলে নড়াচড়া ও হাসির পরিমাণ বেড়ে যায়।
মানসিক চাপ:
মিথ্যে বলার ফলে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হয়। মিথ্যে বলার জন্য মিথ্যেটা সাজাতে হয়, সামনের ব্যক্তি কতটা জানে তা মাথায় রাখতে হয়, আগে কী বলা হয়েছে তার সাথে যেন সামঞ্জস্য থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়, মুখ ফসকে নতুন কিছু যেন বেরিয়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। মাথায় এত কিছু একসাথে করার সময় মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।
মানসিক চাপে থাকলে মানুষ চোখের পলক কম ফেলে, কথা বলার সময় বেশি ইতস্তত করে ও ভুল করে, কথা থেমে থেমে বলে, উত্তর দেওয়ার আগে বেশি সময় নেয়। এছাড়াও হাতের নড়াচড়া কমে যায় ও দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
আচরণ নিয়ন্ত্রণ:
মিথ্যুক মনে করতে পারে যে, মানুষ তার আচরণ দেখে তার কথার সত্য-মিথ্যা যাচাই করবে। তাই সে ইচ্ছে করে তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে মানুষের কাছে সে বিশ্বাসযোগ্য বলে প্রতীয়মান হয়। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের কিছু আচরণ একেবারেই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যেমন, বেশিরভাগ মানুষ স্বেচ্ছায় নিজের ঠোঁট চিকন করতে পারে না। কিন্তু রাগের একটি লক্ষণ হলো ঠোঁট চিকন হয়ে যাওয়া। তাই, কোনো রাগান্বিত ব্যক্তি যদি নিজের রাগান্বিত হওয়াকে অস্বীকার করে, তারপরও ঠোঁট চিকন হয়ে যাওয়ার মতো স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়া তার মিথ্যেটা স্পষ্ট করে দিতে পারে। এছাড়া চাপে থাকাকালীন কণ্ঠের তীক্ষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন। একটি প্রচলিত ধারণা হলো, মিথ্যুকরা মিথ্যা বলার সময় হাত-পা বেশি নাড়ায়। তাই মিথ্যুকরা নিজেকে সত্যবাদী হিসেবে তুলে ধরতে হাত-পা হিসেব করে নাড়াবে। ফলে তাদের নড়াচড়া স্বতঃস্ফূর্ত লাগবে না, বরং পরিকল্পিত ও রোবটিক লাগবে।
এখানে খেয়াল রাখতে হবে যে, এগুলোর মধ্যে যেকোনো একটা লক্ষণ দেখা গেলেই যে কেউ মিথ্যে বলছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, চারটি অঙ্গভঙ্গি ও আচরণের (শরীরের নড়াচড়া, ইতস্তত করা, উত্তর দিতে সময় বেশি নেওয়া এবং হাত/আঙুলের নড়াচড়া) কম্বিনেশনের উপর ভিত্তি করে ৮৪.৬% মিথ্যেবাদীকে শনাক্ত করা গিয়েছে। অথচ, আলাদা আলাদা অঙ্গভঙ্গি ও আচরণের ভিত্তিতে শনাক্তকরণের ফলাফল ছিল হতাশাজনক।[৩] আরেক গবেষণায় গবেষকেরা ৭১-৭৬% সত্য-মিথ্যা শনাক্ত করতে পেরেছেন কয়েকটি আচরণ আমলে নিয়ে।[৪] তাই কয়েকটা লক্ষণ যদি একত্রে প্রকাশ পায় তবে তুমি ধরে নিতে পারো যে, সামনের ব্যক্তি খুব সম্ভবত মিথ্যে বলছে।
সুতরাং, চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, চারদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, বিশেষ করে নজর রাখতে হবে সন্দেহভাজনের দিকে। তবেই না তুমি হয়ে উঠবে তুখোর গোয়েন্দা। আজ এ পর্যন্তই। আজ চলে যাচ্ছি, কিন্তু যাচ্ছি না। আবারও ফিরব পরের পর্বগুলোয়, গোয়েন্দাগিরির নতুন কোনো মন্ত্র নিয়ে। সে পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকো।
তথ্যসূত্র:
১. ১ম পর্বের লিংক - https://sholo.org/detectivity-1st-part
২. Zuckerman, M., DePaulo, B. M., & Rosenthal, R. (1981). Verbal and nonverbal communication of deception. In Advances in experimental social psychology (pp. 1–59). https://doi.org/10.1016/s0065-2601(08)60369-x
৩. Vrij, A., Edward, K., Roberts, K. P., & Bull, R. (2000). Detecting Deceit via Analysis of Verbal and Nonverbal Behavior. Journal of Nonverbal Behavior, 24(4), 239–263. https://doi.org/10.1023/a:1006610329284
৪. Davis, M., Markus, K. A., Walters, S. B., Vorus, N., & Connors, B. (2005). Behavioral Cues to Deception vs. Topic Incriminating Potential in Criminal Confessions. Law And Human Behavior, 29(6), 683–704. https://doi.org/10.1007/s10979-005-7370-z