১. 

“আরিফ সাহেব! আপনি আমাকে কাইন্ডলি বলেন, আমি ঠিক কি কারণে আপনাকে বেতন দিই?”

আলম স্যারের ধমকে তন্দ্রা থেকে বের হয়ে আসলাম। চেয়ার ঘুরিয়ে দেখি, স্যার আমার পেছনে কোমরে দুহাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে্ন। এই বয়সেও স্যার প্রভাবশালী অবয়ব ধরে রেখেছেন। টাক মাথা আর মোটা ওয়্যারফ্রেম চশমার পেছনে এখনো আছে সেই তীক্ষ্ণদৃষ্টি আর মস্তিষ্ক, যা তাকে বানিয়েছিল সাংবাদিকতা-জগতের কিংবদন্তি।

“স্যার?! কিছু হয়েছে? আমি কী করলাম আবার?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“আপনাদের মতো লোক নিয়ে সাংবাদিকতার ব্যাবসায় নেমেছি, আমার তো মনে হয় এরচেয়ে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিলে ভালো হতো। আর টাকায়ও তো মনে হচ্ছে আগুন-ই ধরাচ্ছি, আপনাদের যা অবস্থা!” বললেন আলম স্যার।

আড়চোখে দেখলাম অফিসের বাকি সবাই হঠাৎ কাজে অনেক ব্যস্ত হয়ে গেল। এতক্ষণ ডেস্কে বসে ফোনে পাবজি খেলতে থাকা স্পোর্টস রিপোর্টার খোরশেদ দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেল। স্যারের অবশ্য সেদিকে নজর নেই। তিনি আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন, যেন আমি নিজ হাতে তার সব টাকা আগুনে ছুড়েছি।

“এই যে, আপনাদের প্রতি মাসে এত টাকা বেতন দিচ্ছি, এসির বাতাস খাওয়াচ্ছি, আর প্রশাসনের চোখ থেকে আড়াল করছি। তারপরও আপনাদের কাজের এই অবস্থা দেখে আমি হতাশ। গত দুই মাস ধরে আপনার কোনো রিপোর্ট আমার ডেস্কে আসলো না, অথচ আপনাকে নিয়োগ দেওয়ার সময় কথা ছিল প্রতি দুই সপ্তাহে অন্তত একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হবে।“ বললেন আলম স্যার।

“স্যার, জানেনই তো। খবর নাহয় প্রতিদিন নতুন আসে, কিন্তু আমাদের যে রিপোর্ট, এগুলা লিখতে, খোঁজ নিতে, ফলোআপ করতে তো সময় একটু বেশি লাগে”, ইতস্তত করে বললাম। আশেপাশে, টেবিলে, কম্পিউটারের স্ক্রিনে এমন কিছু খুঁজতে লাগলাম, যা দিয়ে স্যারকে বুঝাতে পারব যে দু’মাস কোনো কাজ না করে বসে থাকিনি। যদিও  খুব ভালো করেই জানি দেখানোর মতো এমন কিছুই নেই আমার কাছে।

“আপনি কোনো ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টার না আরিফ সাহেব, যে আপনার সময় নিয়ে দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র আর ক্রসফায়ারের ব্যাপারে গভীর খোঁজ নিতে হবে। সেন্টার পেজের জন্য কিছু ঠুনকো হ্রদয়গ্রাহী গল্প লিখেন আপনি, যাতে পুরা পেপার পড়ে মানুষ মনমরা আর দেশ নিয়ে দিশেহারা হয়ে না যায়। প্রতি পাড়ায় একজন রিকশাওয়ালা আছে যে সিটে রেখে যাওয়া টাকার ব্যাগ ফেরত দেয়, প্রতি গ্রামে কো্নো এক ছাত্র আছে যে ধানক্ষেতে কাজ শেষ করে বাড়িতে মোমবাতির আলোয় পড়াশোনা করে জিপিএ-৫ পায়। আপনার কাজ এত কঠিন না। তো বলেন আপনি কেন করছেন না? আপনাকে আমি এত টাকা বেতন দিচ্ছি কেন?”

শেষ কথা বলতে গিয়ে আলম স্যার হালকা উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলেন। আমার দিকে ঝুঁকে এসে করুণ দৃষ্টিতে আমার চোখে চোখ রাখলেন। আমি তাকিয়ে থাকতে পারলাম না, লজ্জায় চোখ নিচে নামিয়ে নিলাম।

আসলেই কথা সত্য। পরপর দুটো ডেডলাইন মিস করেছি, আমার ৬ বছরের পেশাজীবনে এই প্রথম। এ বছরের আগে ডেডলাইন মিস করেছিলাম শুধু ৩ বার, তাও ২-৩ দিনের মধ্যে কাজ জমা দিয়ে প্রকাশেরও ব্যবস্থা করেছিলাম।

আলম স্যার হয়তোবা আমার মনমরা চিন্তা আঁচ করতে পারছিলেন। খানিকটা ঠান্ডা গলায় বললেন, “আপনি কি এখনো বোরহান মিয়ার ব্যাপারে নিজেকে দোষ দিচ্ছেন? আপনার তো জানার কোনো উপায় ছিল না যে পরিণতি কেমন হবে। তাই বলে কি আপনি সবকিছু ছেড়ে দিয়ে বসে থাকবেন? একটা বাজে সিচুয়েশনের কারণে নিজের পুরো চাকরিজীবন ধ্বংস করবেন?”

আমি কিছু বললাম না। স্যারের কথা যতই যৌক্তিক হোক, তিনি আমার ভালোর জন্য বললেও, কথাটা পুরোটা মানতে পারলাম না। নিজেকে যতবার বোঝানোর চেষ্টা করি, ততবারই ভাবি আমার ওই রিপোর্ট না বেরোলে বোরহানের জীবন এভাবে নষ্ট হয়ে যেত না।

আলম স্যার ঝুঁকে ছিলেন। এখন আবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। আমার দিক থেকে ফিরে গেলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যেন গভীর কোনো চিন্তায় মগ্ন হয়ে গিয়েছেন। তারপর হঠাৎ আমার টেবিল থেকে একটা কাগজের স্লিপ নিয়ে নিজের পকেট থেকে কলম বের করে একটা কিছু লিখে আমার দিকে হাত বাড়ালেন।

আমি সামান্য বিস্মিত হয়ে কাগজটা হাতে নিলাম। একটা ঠিকানা লেখা, সিদ্ধেশ্বরী রোডের। স্যারের দিকে তাকালাম, তার ঠোটের কোণে হালকা হাসি।

“আপনার কাজ নাহয় আমি একটু এগিয়ে দিই। এই ঠিকানায় যান, পেপারের নাম বললেই হবে। হামজা নামের একজন আছে, দেখা করে আসেন। আর দুশ্চিন্তা করবেন না, বোরহানের মতো কিছু হবে না। আমি গ্যারান্টি দিতে পারব।”

স্যারের কথায় আমি আরও বিস্মিত হলাম। মনে হলো তিনি আমাকে কোনো দিকনির্দেশনা না দিয়ে এক গোলকধাঁধার মাঝে ছেড়ে দিয়েছেন। বিস্ময় দূর করতেই জিজ্ঞেস করলাম, “কেন যাব তার কাছে? কে তিনি?”

“প্রথম প্রশ্নের উত্তর আপনি সেখানে যাবার পর পাবেন। দ্বিতীয়টা আমি বলতে পারি। তিনি একজন রহস্যারোহী।”

২.

এক ঘণ্টা পর আমি সিদ্ধেশ্বরী রোডের সেই ঠিকানায় পৌঁছলাম। হাউজ নাম্বার মিলিয়ে দেখলাম ঠিক জায়গায় এসেছি কিনা। একটা পুরোনো তিনতলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাড়ির বাইরের দেয়াল লাল ইটের তৈরি। গেটের ভিতর ছোট উঠানের এক দিকে ছোট বাগান। অন্যদিকে খালি জায়গা। ওটা বোধহয় গাড়ি পার্কিং-এর জন্য ব্যবহৃত হয়, যদিও বর্তমানে কোনো গাড়ি সেখানে দেখছি না।

বাড়িটা বেশ পুরোনো, ষাট-সত্তরের দশকের হবে। ঢাকা শহরে এমন বাড়ি আর খুব একটা দেখা যায় না। সব পুরোনো বাড়ি ভেঙ্গে হয় নতুন এপার্টমেন্ট বিল্ডিং করা হয়েছে, আর না হয় হাইফাই শপিং মল। খোদ সিদ্ধেশ্বরী রোড আর পাশের বেইলি রোডেই এই চিত্র লক্ষণীয়। সময়ের এই অগ্রগতিতে এই বাড়িটা হারানো সময়ের এক অবশিষ্ট স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।

আমি এগিয়ে গেটের পাশের কলিং বেলে টিপ দিতেই এক বুড়ো দাড়িওয়ালা দারোয়ান গেট খুলে ভেতর থেকে শরীরের কিছুটা বের করলেন। তার হাতে শলার ঝাড়ু, মুখ পানের পিকে লাল।

“আফনি কে? কারে ছান?” বলল দারোয়ান। তার গলা বেশ নাকি; নাকে লাগিয়ে কথা বলে। কথার ধরনে হালকা ক্রুদ্ধতাও শুনতে পেলাম মনে হলো।

“এটা কি হামজা সাহেবের বাসা? তার সাথে দেখা করতে এসেছি।“ বলার সময় গেটের দিকে হালকা এগোলাম ভেতরটা আরেকটু দেখার জন্য। কিন্তু দারোয়ান সাহেব রাস্তা আটকে রাখল।

“আফনি কে তা বলেন? কে ফাটাইসে?”

লোকের নাকি টান আর প-কে ফ-বলায় প্রশ্ন শুরুতে না বুঝে হালকা বিব্রত হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরে প্রশ্ন বুঝে উত্তর দিলাম, “আমার নাম আব্দুল্লাহ আরিফ। আমি একজন সাংবাদিক।“

লোকটার চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে গেট বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করল।

“এহানে হামজা নামের কেউ নাই। আফনি যান। আফনি কারে খুজসেন আমি জানি না।” কথাগুলো একনাগাড়ে বলতে বলতে দারোয়ান গেট বন্ধ করার চেষ্টা চালিয়ে গেল।

আমি তাড়াতাড়ি আমার হাত গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম, যাতে গেট বন্ধ করতে না পারে।

“প্লিজ, আমি শুধু দেখা করতে এসেছি, আর কিছু না। হামজা সাহেবকে কোথায় পাওয়া যাবে, তার বাসা কোনটা যদি দেখিয়ে দিতেন…“

“আমি বললাম না এই নামের কেউ এহানে নাই? আমরা হেই নামের কাউরে সিনি না, আফনি যান!”

দারোয়ান আমার হাত গেট থেকে বের করতে ততক্ষণে সক্ষম হয়েছে। আর একটু হলেই গেট বন্ধ হয়ে যায়। আমি মনে মনে ভাবা শুরু করে দিলাম আলম স্যারকে কল করে বলব যে ঠিকানায় গিয়েছি, কাউকে পাইনি। তারপর কল রেখে বেইলি রোডের কোনো এক পেস্ট্রি শপে বসে এক কাপ কফি আর হালকা লাঞ্চ সেরে অফিসে চলে যাব।

মাথায় এই সব চিন্তা করতে করতে যেই হেরে যাওয়ার উৎসব শুরু করব, ঠিক তখনই ভেতর থেকে একটা ভারী গলা শুনলাম।

“বাসেত ভাই! কে এসেছে? এত আওয়াজ কীসের?”

“স্যার, কিছু না। আফনি ভিত্রে বসেন। এক দুবিত্তো আইসে, আমি দেখতাসি। আফনি ভিত্রে যান।”

চলে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও নিজেকে দুর্বৃত্ত হিসেবে চিহ্নিত করায় রেগে গেলাম। বেশ জোর গলায় বলে উঠলাম, “আপনি কাকে দুর্বৃত্ত ডাকছেন? আমি বললাম না আমি একজন সাংবাদিক!”

এবার আবার সেই ভারী গলা শোনা গেল, আরও কাছ থেকে। 

“সাংবাদিক? বাসেত ভাই, আপনি সরেন। আমি কথা বলে নিচ্ছি।”

গেটটা আবার খুলে গেল, দারোয়ানের পাশে নতুন একজন আসল। মধ্যবয়স্ক হবেন, কিন্তু বয়স আলম স্যারের চেয়ে কম। লম্বায় ছ’ফুট, বা আরও বেশি। আধপাকা চুল সব পেছনের দিকে আঁচড়ানো, তার নিচে বড় কপালের মাঝে হালকা কালো দাগ। চোখে কালো প্লাস্টিকের মোটা ফ্রেমের চশমা। লোকটার দাড়িও লম্বা, কিন্তু অদ্ভুত সোজা। গাল ও থুতনি থেকে যেন কালো-সাদা সরলরেখা বুকের দিকে যাচ্ছে। পরনে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি। এবং তার আবির্ভাবের সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিস, ডান হাতে একটা লাঠি।

দারোয়ান আবারও বলা শুরু করল যে, সে আমাকে বিদায় করে দিচ্ছে, কিন্তু এই নতুন আগন্তুক এক হাত উচিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার নামটা শুনিনি। আপনি কোথাকার সাংবাদিক?”

রাগ দমিয়ে গলা ঠান্ডা করে আবারও পরিচয় বললাম, “আমার নাম আব্দুল্লাহ আরিফ। আমি একজন সাংবাদিক, দৈনিক সূর্যোদয়ের।“ বলেই পকেট থেকে অফিসের আইডি কার্ডটা বের করে বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে।

লোকটা বেশ মনোযোগ দিয়ে কার্ডটা দেখলেন। তারপর বললেন, “সূর্যোদয়? আপনি কি আলম সাহেবের সাথে কাজ করেন?”

“জি, তিনি আমার বস। তিনিই আমাকে এই ঠিকানা দিয়ে বলেছেন হামজা নামের একজনের সাথে দেখা করতে।“ বললাম আমি।

“কী কাজে পাঠিয়েছে আপনাকে?”

“তা বলে দেননি। শুধু বলেছেন এখানে আসার পরে বুঝতে পারব।“

লোকটা এই কথা শুনে নিচে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তারপর গেটের সামনে থেকে সরে বললেন, “ভেতরে আসুন। বাসেত ভাই, ভেতরে গিয়ে বলেন দুজনের চা দিতে।“

দারোয়ান আমাকে আড়চোখে দেখে বাড়ির দিকে আগাল। আমি গেটের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে অচেনা লোকটা আমার আইডি কার্ড ফেরত দিয়ে বললেন, “আমার দারোয়ান কিছুটা প্যারানয়েড। সাংবাদিক, পুলিশ এদের কারণে বেশ হয়রানি হয়েছে আগে। মাফ করে দিন। আলম সাহেব যেহেতু আপনাকে পাঠিয়েছেন, আপনাকে অবশ্যই সময় দেওয়া হবে।“

এরপর তিনি তার হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আসসালামু আলাইকুম। আমি হামজা হামিদ।”