আল্লাহ যাকে কখনো খালি হাতে ফেরাতেন না  

গত পর্বে[১] আমরা দেখেছিলাম সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনি এবং তাঁর পরিবারের, বিশেষ করে তাঁর মায়ের শত বাঁধার মুখেও তার ইসলামের উপর টিকে থাকার লড়াই। আসলে সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একমাত্র সত্য দ্বীন ইসলামের জন্য, তাঁর রবের জন্য পুরো পৃথিবীর বিপক্ষেও দাঁড়াতে প্রস্তুত ছিলেন ।

একদিন সাদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মায়ের জন্য দুআ করুন, যেন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু’হাত তুলে দুআ করলেন। সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিজের মুখেই এরপরের ঘটনা শোনা যাক। সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “আমি আমার বাড়িতে ফিরে গেলাম। আমি বাড়ির দরজা খোলামাত্র শুনতে পেলাম আমার মা কালিমা শাহাদাত পাঠ করছেন ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই…’”।

বদরের যুদ্ধের সময় সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর নিকট দুআ করেন, “ও আল্লাহ! মক্কার পৌত্তলিকদেরকে দুর্বল করে দিন।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাদের দুআর পর তিনি তৎক্ষণাৎ দুআ করলেন, “ও আল্লাহ! আপনি সাদের দুআ কবুল করুন”। বলাই বাহুল্য যে সেদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সাদের দুআ কবুল করেছিলেন। সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “এই ঘটনার পর থেকে কোনো দিন এমন হয়নি যে, আমি আর-রহমান আল্লাহর নিকট হাত তুলে কিছু চেয়েছি, আর তিনি খালি হাতে আমায় ফিরিয়ে দিয়েছেন”। আসলে সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি মনেপ্রাণে চাইতেন যেন আল্লাহ তাঁর দুআর উত্তর দেন।

দুআ কবুল হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো হালাল উপার্জন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “বহু লোক দীর্ঘ সফর করে আসে (হজ, উমরাহ ইত্যাদি পালন করার জন্য), তাদের দেহ ধূলি ধূসরিত এবং চুলগুলো এলোমেলো থাকে। তারা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে বলে, ‘হে আল্লাহ! হে আল্লাহ!’। কিন্তু তাদের পরিধেয় হারাম এবং তাদের বস্ত্র হারাম। এমন অবস্থায় তাদের দুআ কীভাবে কবুল হবে?” (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১০১৫)

আমাদের সমাজে হারাম উপার্জনকে তেমন কোনো পাপের কাজ মনেই করা হয় না। হয়তো এ কারণেই আল্লাহ আমাদের দুআর জবাব দেন না।

সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হারাম উপার্জনের ব্যাপারে এতই সতর্ক ছিলেন যে, কোনো কিছু খাওয়ার আগে তিনি অবশ্যই জেনে নিতেন এটা কোথা থেকে এসেছে।

সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু কুফার গভর্নর থাকাকালীন ঘটনা। তিনি একদিন দেখলেন এক লোক একদল লোকের সামনে আলী বিন আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অভিশাপ দিচ্ছে। তিনি সেই লোকটিকে বললেন, “ভাই আমার! আলীকে অভিশাপ দিয়ো না, কারণ আমি দেখেছি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলীকে বলেছেন, ‘মুসার কাছে হারুন যেমন ছিল, তুমিও আমার কাছে ঠিক তেমনটাই’”।

সেই লোকটি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অভিশাপ দেওয়া বন্ধ করল না। বাধ্য হয়ে সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “তুমি যদি আলীকে অভিশাপ দেওয়া বন্ধ না করো, তাহলে আমিও তোমাকে অভিশাপ দেবো”।

সেই লোকটি এরপরেও অভিশাপ দিতে থাকল।

সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদে গিয়ে ওযু করে দুই রাকাত সালাত আদায় করে আল্লাহর দরবারে হাত উঠালেন সেই লোকটিকে অভিশাপ দেওয়ার জন্য। তারপরে চোখের পলকে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে গেল। কোথা থেকে একটা বুনো উট এসে হাজির হলো। সে সোজা অভিশাপকারী সেই লোকটির কাছে গিয়ে শিং দিয়ে তাকে আঘাত করতেই থাকল যতক্ষণ না সে মারা যায়।

সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বৃদ্ধাবস্থায় তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তাঁর কাছে অনেক অসুস্থ লোক এসে তাঁকে অনুরোধ করত, তিনি যেন আল্লাহর কাছে তাদের আরোগ্যের জন্য দুআ করেন। সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের জন্য দুআ করলে আল্লাহ তাদের আরোগ্য দান করতেন। তো, যখন তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললেন, তখন একজন এসে তাঁকে বলল, “হে সাদ! আপনি আল্লাহর কাছে কেন নিজের আরোগ্যের জন্য দুআ করছেন না?” সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু উত্তর দিলেন, “না, আমি আল্লাহর কাছে আমার জন্য কখনোই দুআ করব না। আমার লজ্জা লাগে। আল্লাহ আমাকে এত বছর নিয়ামত ভোগ করতে দিয়েছেন। এখন তিনি তা কেড়ে নিতেই পারেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে দৃষ্টিশক্তি তুলে নেওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করেন, তখন সে বান্দা যদি সবর করে তাহলে আল্লাহ সেই বান্দাকে জান্নাত পুরস্কার দেন’। কাজেই আমি সবর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি”।

আর আমরা হালকা বালা-মুসিবতে পড়লেই অস্থির হয়ে যাই। অকৃতজ্ঞের মতো বলে ফেলি, “সব সময় আমার সাথেই কেন এমনটা হয়…”

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদেরকে সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর মতো হারাম উপার্জন থেকে দূরে থাকার এবং সবর করার তৌফিক দান করুন। আমীন।

(চলবে ইনশাআল্লাহ… )

১. শাইখ জহির মাহমুদের লেকচার অবলম্বনে। প্রথম পর্ব পড়ে নাও এই লিংক থেকে: https://sholo.org/saad-ibn-abi-waqqas-01