ঘটনা-সংক্ষেপ: মিরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের খেলা দেখতে থাকে, কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করে তার ছেলে কেরেম সেখানে নেই। খেলার ফাঁকে কেরেম চলে যায় রহস্যময় ১৩২ নম্বর কবরের কাছে, যে কবরটির ফলকে মৃত্যুসাল লেখা নেই। কবরের ভেতরে শব্দ ও নড়াচড়া শুরু হয়, আর কেরেম সাহস করে কাছে গিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করতে থাকে। হঠাৎ অর্ধগলিত এক হাত তাকে কফিনের ভেতর টেনে নিতে চাইলে কেরেম এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার সীমা ঝাপসা হয়ে যায়। এরপর…
১০ অক্টোবর, ২০২৪
সিনান
“কালকে না পরীক্ষা, সিনান?”
আম্মুর কথায় খেয়াল হলো। আসরের সময় হয়ে গিয়েছে। নামাযে যাওয়া উচিত। রাতে পড়া যাবে। চিন্তা করছি, ঊনিশ শতাব্দীতে যখন কলেরা মহামারি দেখা দিল, তখন মৃত্যুর ভয়ের চেয়ে বেঁচে থাকার ভয় মানুষের মধ্যে বেশি কাজ করত। বেঁচে থাকার ভয়?
অদ্ভুত একটা বই। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় কয়েকটা নাম লেখা:
রবার্ট রবিনসন। ডিউক ফার্দিনান্দ। ডক্টর এডলফ গাটসমাথ।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় একটা গল্প। খুঁজছি গল্পের কোথায় এই নামগুলো আছে। এই নামগুলোর সাথে গল্পের এখনো কোনো মিল পেলাম না। কাল পরীক্ষা আছে বটে, তবে এ নামের সাথে সম্পর্ক বের না করে আমি ঘুমাচ্ছি না। ডক্টর এডলফ গাটসমাথ, তাই না? ডক্টর এডলফ… গাটসমাথ…
২৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৯২
প্রসিকিউটর কাভজি
আজকের কেইস দু’টো। প্রথমত, কফিনের ভেতর থেকে লাশ গায়েব, আর দ্বিতীয়ত একটা ছোট বাচ্চা ছেলে নিখোঁজ। ছেলেটার নাম কেরেম। বয়স ১৩, হালকা গড়ন, সাহসী। ভালো বাস্কেটবল খেলে। স্কুলের মূল দলের ক্যাপ্টেন। শারীরিকভাবে অসম্ভব সুস্থ, যে কেউ ওকে দেখিয়ে বলে “কেরেমের মতো হও”। কেরেমের মা-বাবার, বন্ধুদের সাথে কথা বলে বুঝলাম মানসিকভাবেও প্রচণ্ড শক্ত এই ছেলে। একজন সুস্থ-সবল কিশোর কেন একটা কবরের সামনে বসে থাকবে?
আমরা কেউ এখনো নিশ্চিত না কেরেম আসলে ঐ সময়ে কোথায় ছিল। কেরেমের বন্ধুদের জবানবন্দি অনুযায়ী সে কয়েকদিন ধরে খেলার সময় একটা কবরের সামনে বসে থাকত। সন্ধ্যার আগে চলে আসত। তবে আজ ছিল ব্যতিক্রম। না তার বন্ধুরা খেয়াল করেছে সে কোথায়, আর না সে বাসায় ফিরেছে। বাচ্চাদের জবানবন্দি নেবার আগে আমরা জানাইনি যে, কবর থেকে লাশ চুরি হয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাচ্চারা যে কবরের নাম্বার বলেছে, ঠিক সেখানেই খোঁড়া হয়েছে। আমি নিজে গিয়ে দেখেছি। এলোমেলো খোঁড়ার চিহ্ন, একপাশ থেকে শুরু হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে হাত দিয়ে খোঁড়া হয়েছে। হতে পারে এটা কেরেম। কবরের আরেকপাশেও খোঁড়ার চিহ্ন। এটা দা দিয়ে, বেশ নিয়ন্ত্রিত। এ পাশটায় একজন বড় মানুষের পুরো দেহ বের করা যাবে এমনভাবে কাটা। না, তার চেয়ে একটু বেশিই। ভেতরের দৃশ্য খুবই সাধারণ। কফিন ভাঙা হয়েছে হাতুড়ি দিয়ে। ১৩২ নম্বর কবরটা একজন নারীর, গামজে কারামোওলু। আরকান কারামোওলুর স্ত্রী। কমবয়সী, সুন্দরী ও উচ্চবিত্ত পরিবারের এই নারী কয়েকদিন আগে মারা যান কলেরায়। কফিনে আছে তার ব্যবহারের মুক্তোর মালা, ঝকঝক করছে এখনো; একটা গাউন, হাতঘড়ি, দামি জুতো আর মূল্যবান কিছু সোনার অলঙ্কার। বড়লোকদের কবর চুরি হওয়া ইদানীং নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্দেশ্য খুবই পরিষ্কার, ভেতরে থাকা দামি জিনিসপত্র উদ্ধার করা। তবে গামজে কারামোওলুর ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। কারণ মূল্যবান কিছুই চুরি হয়নি, শুধু গাউনটা বাদে। তাহলে কি চুরি হয়েছে মৃত গামজে কারামোওলু, আর খুব সম্ভবত জীবিত কেরেম?
আমি কোনোভাবে এর কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছি না। একজন জীবিত মানুষ হারিয়ে যাওয়া বেশি ভয়ের নাকি একটা মৃত লাশ? কোনো স্বার্থ ছাড়া অর্ধগলিত লাশ তুলে নিয়ে একজন মানুষ কী করবে? যদি কেরেম এখানে থাকে, আর ব্যাপারটা দেখে ফেলে, তাহলে সেটা লুকোনোর কী প্রয়োজন? আর একটা ১৩ বছরের ছেলে নির্জন কবরের সামনে একা কেনই বা অপেক্ষা করবে? ঘটনাগুলো একে-অপরের সাথে কীভাবে যুক্ত?
১১ অক্টোবর, ২০২৪
সিনান
বইটা বন্ধ করলাম। সকাল ৭টা বেজে ২৩ মিনিট। এটা আজ শেষ করতে পারব না। আমি বিশ্বাস করতে চাই এটা গল্প। কিন্তু কিন্তু কিন্তু…
“সিনান? ঘুম থেকে ওঠো, ক্লাসে যাবে না?”
“তৈরি হচ্ছি, আন্নেম১। আসছি।”
পুরোটা সময় ক্লাসে মন বসলো না। পরীক্ষাটা দেবো না ভাবছিলাম, কিন্তু আজ একটা স্টাডি ট্যুর আছে। এসব ট্যুর আমার কোনোদিনই ভালো লাগত না। প্রচুর তথ্য আর লেকচার শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। এই ট্যুরের ঘটনাটা না বললে অন্যায় হয়ে যাবে আপনাদের সাথে। পরীক্ষার পর হোজাম২ ওমর আমাদের একটা অদ্ভুত কফিন দেখাতে নিয়ে গেলেন। ১৭৯৮ সালে জার্মান ধর্মজাজক পি. জি. পেসলার একটা নতুন ধারণা নিয়ে আসেন। কফিনের ভেতরে একটা চিকন নল থাকবে। নলের সাথে ঝুলানো থাকবে একটা ঘণ্টা। কর্ড বা সূতা টান দিলে ঘণ্টাটা বাজবে। পরবর্তীতে এটাকে আরও উন্নত করা হয়। কফিনের ভেতরে খাবার সরবরাহের প্রস্তাব দেন ডক্টর এডলফ গাটসমাথ। তবে এতে একটু ঝামেলা হয়ে যায়। যে নল বা টিউবগুলো ব্যবহার করা হয় সেগুলোর ভেতর দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে যেত, প্রায়শই পোকামাকড়ও ঢুকে যেত। মিশরে কফিনের ভেতর অনেক সম্পদ, খাবার দিয়ে কবর দেবার প্রচলন ছিল। তবে ইউরোপের নল বা পাইপ ব্যবস্থা একটা বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা…৩
হোজাম ওমরের আর কোনো কথাই আমার মাথায় ঢুকল না। আমার কানে বারবার বাজছিল ডক্টর এডলফের নাম। জীবন কতটা কাকতালীয়! কয়েক ঘণ্টা আগে পড়া কোনো বইয়ের অপরিচিত লেখকের নাম আমি শুনছি, তাও আবার স্কুলের স্টাডি ট্যুরে। এক মিনিট, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা?
২৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৯২
কেরেম
হাতে ব্যান্ডেজ করা এক নারী কেরেমের মুখোমুখি বসা। কেরেমের জ্ঞান ফিরেছে ৪-৫ মিনিট হবে। শূন্য, প্রায় অন্ধকার রুম। কিছু মোমবাতি জ্বলছে। সামনের নারীর পরনে সাদা গাউন পরা, মাথায় স্কার্ফ, মোলায়েম হাসি, তবে দাঁতের জায়গায়-জায়গায় ক্ষত। ক্ষতের কারণে হাসিটা ভয়ানক লাগছে, যেন চোখ দিয়ে ঢুকে পড়ছে বুকের ভেতর।
- নাম কী তোমার?
- কেরেম।
- শুধুই কেরেম?
- কেরেম আমেন।
- সুন্দর নাম। কোথায় থাকো?
- আপনার এসব কথার উত্তর দেবার জন্য আমি আপনাকে বাঁচাইনি। আপনি আমাকে বেঁধে রেখেছেন কেন?
- হা হা হা। তা অবশ্য ঠিক। তুমি খুব সাহসী ছেলে কেরেম। তোমাকে একটা কথা বলি? তোমাকে বেঁধে রাখার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। তবে একটা প্রতিশ্রুতি দিতে হবে আমাকে। দিতে পারবে?
- আমি বাসায় যাব। আর আমি প্রতিশ্রুতি রাখি। বলুন।
- আমি বিয়ে করছি। এটা কাউকে বলবে না। এতটুকুই।
- কাকে বিয়ে করছেন?
- বুদ্ধিমান ছেলে!
- আমি আপনার কাছ থেকে প্রশংসা শুনতে চাইনি।
পাশ থেকে একজন লোক বেরিয়ে এলো। আলো-আধারিতে লোকটির চেহারা বোঝার কোনো উপায় নেই। ছায়ার ভেলকিবাজিতে লোকটার সুঠাম শরীর আর কঠিন বাহু গতকাল রাতের কথা মনে করিয়ে দিল কেরেমকে। ঘাড়ের ওপর যে হাতটা শক্ত করে ধরেছিল কেরেমকে, সে হাতটা এই দানবাকৃতির লোকটিরই।
গামজে কারামোওলু খুব সুন্দর করে হাসলেন। হাসার সময় তার গালে ছোট্ট একটা টোল পড়ে, ঠিক তার নামের মতো; ‘গামজে’ অর্থ ‘টোল’। এরপর বললেন,
- প্রশংসা করতে কি অনুমতি লাগবে?
কেরেম হেসে ফেলল। “আমি আপনার জন্য খুশি। আপনার জীবন সুখের হোক।”
- ধন্যবাদ। তোমাকে মনে রাখব। জানি না আর দেখা হবে কিনা, কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ। যদি সম্ভব হতো তোমাকে আসতে বলতাম…
- আমাদের দেখা হবে না।
- তুমি নিশ্চিত?
- আমি নিশ্চিত।
গামজে কেরেমের হাতের গিঁটগুলো খুলতে লাগলেন। দানবাকৃতির লোকটি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে কেরেমের দিকে। চোখের মণি ডানে-বায়ে নড়ছে, ঠিক যখন মানুষ কাউকে মনে করার চেষ্টা করে, কিন্তু মনে পড়ে না; তখন এমনটা হয়।
(চলবে ইনশাআল্লাহ… )
রেফারেন্স:
১. আন্নেম - আমার মা
২. হোজাম - শিক্ষক/স্যার
৩. Safety coffin - Wikiwand. Retrieved September 20, 2025, from https://tinyurl.com/my7a2jm