- আব্দুল্লাহ আল রায়হান মাদানী
একদিন আব্বুর কাছে জানতে চাইলাম, আমি তো দাদা পর্যন্ত আমাদের পরিবারের পুরুষদেরকে চিনি, অর্থাৎ নাম জানি। তার পূর্বের পুরুষদেরও তো চেনা উচিত। অস্তিত্বের তাৎপর্য বুঝার জন্য শেকড় চেনা জরুরি। আমাকে বলুন। আব্বু মনে হয় সাত পুরুষ পর্যন্ত চেনাতে পেরেছেন।
ইসলামের সিলসিলায় ‘নসবনামা’ বা ‘বংশতালিকা’ নামে আলাদা একটা শাখাই রয়েছে। অর্থাৎ, বংশ চেনা, নিজের অতীত চেনার বিষয়টি ইসলামের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বের সাথে চর্চিত হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে এর কদর আরও বেশি ছিল। সেসময় নসবনামা মুখস্থ করায় এবং তা বর্ণনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তিনি শুধু নিজের বংশের নয়, বরং আরবের বিভিন্ন গোত্রের নসবনামা সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান রাখতেন। এমনকি জাহিলিয়াতের সময়েও তিনি এ বিষয়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। মানুষ যখন কোনো বিষয়ে দ্বিধায় পড়ত, তখন তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসত। তাঁর এই জ্ঞান ইসলাম প্রচারেও অনেক সহায়ক হয়েছিল, বিশেষত যখন বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপন বা তাদের বংশীয় মর্যাদা বোঝার প্রয়োজন হতো।
কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের মধ্যে যারা নবী ছিলেন, তাদের কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ, এই যে পূর্বপুরুষ চেনা অথবা চেনানো, এই যে নিজের শেকড় চেনা অথবা চেনানো - এটা কুরআনেও রয়েছে।
এই বর্ণনার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইতিহাসের সাথে সংযোগ স্থাপন, দ্বীনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বিশ্বাস ও আদর্শের ধারাবাহিকতা এবং তার শক্তিমত্তা বোঝানো।
এটা যেমন পারিবারিক দিক থেকে জরুরি, তেমনি জরুরি কোনো ভূমির দ্বীনের ইতিহাসের দিক থেকেও। আর এটা তো জানা কথা যে, মুসলিমদের রক্তের সম্পর্কের চাইতে দ্বীনের সম্পর্কটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ভূমিতে দ্বীন আগমনের, দ্বীন প্রচারের ইতিহাস জানা সেই ভূমিতে টিকে থাকা, সেই ভূমির উত্তরাধিকার আদায় করার জন্য অতীব জরুরি।
তোমাদেরকে যদি এখন জিজ্ঞেস করি আমাদের এই ভূমিতে ইসলামের যাত্রা কবে থেকে শুরু হয়েছে? অধিকাংশই হয়তো উত্তর দেবে, এই তো ১২০৬ সালের দিকে, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজীর অভিযানের মধ্য দিয়ে।
তোমাদের উত্তর ভুল। এই ভূমিতে আমাদের ইতিহাস, আমাদের দ্বীন ও অস্তিত্বের ইতিহাসের শুরু ১২০৬ থেকে না। এই গৌরবময় ইতিহাসেরও এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ভূমির মানুষদেরকে তার মহান দ্বীন দ্বারা এই সময়েরও বহু আগে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ইসলামের প্রথম দিকেই সম্মানিত করেছেন।
শুনতে অবাক লাগছে, তাই না? লাগারই কথা। আমাদেরকে তো আমাদের বাপ-দাদাদেরকে চিনতে দেওয়া হয়নি।
চলো, আজ আমরা আমাদের অস্তিত্বের সেই শেকড়টাই জানি।
আমাদের শেকড় এই মাটির এবং তার ইতিহাসের কতটা গভীরে প্রোথিত, তা জানতে হলে আমাদের যেতে হবে লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস মৌজায়। এখানে মাটির নিচে লুকিয়ে আছে চেপে রাখা এক ইতিহাস, আমাদের অস্তিত্বের প্রাচীনতার এক জীবন্ত সাক্ষী।
বিস্ময়কর আবিষ্কার
একসময় রামদাস মৌজার এই জায়গাটি ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। স্থানীয়রা একে ডাকত ‘মজদের আড়া’ নামে। এই নামের মধ্যেই যেন লুকিয়ে ছিল গভীর এক রহস্য - ‘মজদের আড়া’ মানে ‘মসজিদ আছে এমন জঙ্গল’। বছরের পর বছর ধরে এই নামটি প্রচলিত থাকলেও এর পেছনের কারণ কেউ জানত না। ১৯৮৫ সালের কোনো একদিন গ্রামের মানুষ জঙ্গল পরিষ্কার করতে গিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে আসে কিছু প্রাচীন ইট। মাটি সরাতে সরাতে একসময় বেরিয়ে আসে একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর। আর তখনই স্থানীয় বাসিন্দা আইয়ুব আলীর হাতে আসে একটি বিশেষ ইটের টুকরা। ইটের ওপর আরবিতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল: “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ, হিজরি সন ৬৯”।
এই শিলালিপি আবিষ্কারের পর বাংলায় ইসলামের ইতিহাসের প্রচলিত ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।
মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল ৬৯ হিজরি, অর্থাৎ ৬৮৮-৬৮৯ খ্রিস্টাব্দে। অবাক করা বিষয় হলো, এটি নির্মিত হয়েছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওফাতের মাত্র ৫৮ বছর পর! এই আবিষ্কারের পর দেশ-বিদেশ থেকে শতাধিক প্রত্নতত্ত্ববিদ ও গবেষক ছুটে আসেন। তাদের গবেষণা প্রচলিত ইতিহাসকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলে, বাংলায় ইসলামের প্রথম আগমন ঘটেছিল সপ্তম শতাব্দীতে।
প্রখ্যাত ব্রিটিশ গবেষক টিম স্টিলসহ আরও কয়েকজন ইতিহাসবিদ রোমান ও জার্মান লেখকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই আরব ও রোমান বণিকরা ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদী দিয়ে নৌবাণিজ্য করতেন। সম্ভবত এই বাণিজ্যপথ ধরেই কোনো সাহাবি এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, এই সাহাবি ছিলেন সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু), যিনি একই পথে চীনেও ইসলাম প্রচারে গিয়েছিলেন।
কালের পরিক্রমায় মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া এই মসজিদটি এখন ‘সাহাবায়ে কেরাম মসজিদ’ নামে পরিচিত। বর্তমানে পুরোনো মসজিদের ধ্বংসাবশেষকে নতুন মসজিদের নিচে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এই যে বাংলার জমিনের মুসলিমদেরকে ২৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেক্যুলার কাঠামো দ্বারা শোষণ করা হচ্ছে, তারপরেও কি এখানে মুসলিমদের সংখ্যা কমেছে? সাংস্কৃতিক জমিদাররা আমাদেরকে মিথ্যে ইতিহাস পড়ায়, আমাদের বাপ-দাদাদের পরিচয় সম্পর্কে আমাদেরকে অসচেতন করে রাখার চেষ্টা করে, আমাদের পরিচয় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ফেলতে চায়, আমাদের দ্বীন চর্চার জায়গা সঙ্কুচিত করে দিতে চায়, তারপরেও কি এখানকার মানুষ ইসলাম থেকে দূরে সরেছে? আমাদের অনেক অনেক ভুল আছে, কিন্তু আমাদের মানুষরা ইসলামকে ভালোবাসে, ইসলামকে অবলম্বন করেই বাঁচতে চায়। কারণ, এটাই তার শেকড়, শুধু পরিচয়ের না; সমৃদ্ধ্বিরও।
এই মসজিদ আমাদের অস্তিত্বের, সমৃদ্ধির শেকড়ের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করে। এই মসজিদের আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, এই ভূখণ্ডে ইসলামের আগমন ১২০৬ সালে নয়, বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় বা তার খানিক পরেই শুরু হয়েছিল। অর্থাৎ, এই মাটির সঙ্গে ইসলামের সম্পর্ক এক হাজার তিনশ’ বছরেরও পুরোনো। এটি কেবল ইতিহাসের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের দ্বীনি শেকড়ের গভীরতা এবং দৃঢ়তার প্রতীক। এই মসজিদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সেই মহিমান্বিত ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা জ্ঞানের আলো এবং দ্বীনের আহ্বানে এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল।
তোমরা সেই পরিচয়কে পুনঃরুদ্ধারে নিজেকে নিয়োজিত করো। এটা আমাদের, তোমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব, যা আল্লাহ আমাদের উপর ন্যস্ত করেছেন।
তথ্যসূত্র:
১. Harano Masjid. Offroad Bangladesh. https://tinyurl.com/yft3t92s
২. দৈনিক জনকণ্ঠ. (২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০). লালমনিরহাটে তেরশত ত্রিশ বছরের পুরোনো সাহাবা মসজিদ https://tinyurl.com/mvvv5v7m
৩. Roy, S. D. (2013, March 27). Ruins of a lost mosque. The Daily Star. https://tinyurl.com/2y8znhsf
৪. Al Jazeera. (2012, August 18). Ancient mosque unearthed in Bangladesh. https://tinyurl.com/ycr52dac
৫. Steel, T. (2013, September 5). Lost mosques. Dhaka Tribune. https://tinyurl.com/57hka4xv