এক.
হাসানের কথা:
হ্যান্ডস আপ![১] আর এক পা এগুলে মাথা থাকবে, কিন্তু মাথার খুলি থাকবে না! আমার পিস্তলের গুলি কখনো মিস হয় না! বরফ শীতল কণ্ঠে হুমকি দিলাম। এরপর হেসে উঠলাম হা হা করে। পিলে চমকানো, ক্রিমিনালের কলজে পানি করা অট্টহাসি নয়। খুশির অট্টহাসি।
আয়নার সামনে নিজের পারফরম্যান্স দেখছিলাম। একেবারে সেই লেভেলের হয়েছে। রিভলবার ধরার কায়দা, দাঁড়ানো, হুমকি দেওয়া… সব একেবারে পারফেক্ট। এমন হুমকি শুনলে ক্রিমিনালরা প্যান্ট ভরে হিসু করে দেবে আমি নিশ্চিত। রিভলভারটাও কিনে এনেছি এমন যে, কেউই বুঝতে পারবে না এটা আসল নয়, খেলনা!
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কেন এমন হুমকির প্র্যাকটিস করছি? টিকটকে একাউন্ট খুলেছি কিনা সেই প্রশ্ন বোধহয় তোমাদের মাথায় এসেছে। আরে ধুর্… টিকটক করতে যাব কেন। খুবই সিরিয়াস! খুবই সিরিয়াস ঘটনা ঘটে গেছে দুদিন আগে।
হুট করে সে রাতে ঝড় উঠল। ঝড় মানে কঠিন ঝড়। আমি ছিলাম পড়ার টেবিলে। বাবাকে ফাঁকি দেবার জন্য স্রেফ বইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ঝড়ে বাইরে থেকে অনেক ধুলোবালি চলে আসবে। তাই ভাবলাম জানালা বন্ধ করে দিই। জানালা বন্ধ করতে গিয়েছি এমন সময় চোখে পড়ল, কে জানি আমাদের আমবাগানের ভেতর ঘোরাফেরা করছে। ভাবলাম, ঝড়ে আম কুড়াতে এসেছে বোধহয়। তেমন কিছু ভাবিনি। জানালা বন্ধ করে চলে আসলাম।
পরদিন সকালবেলা পড়ার টেবিলে গিয়ে দেখি একটা চিরকুট পড়ে আছে। লাল কালিতে বড় বড় করে লেখা একটা শব্দ - ‘খুন’!
ভয়ের একটা শীতল স্রোত নেমে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে। কিন্তু স্বাভাবিক হয়ে গেলাম একটু পরেই। গতকাল রাতে ঝড় হয়েছিল। হয়তো বাইরে থেকে উড়ে এসেছে এই চিরকুট।
দলা পাকিয়ে ময়লার ঝুড়িতে রাখার জন্য চিরকুটটা হাতে নিলাম। আরেকবার চোখ বুলানোর ইচ্ছা হলো কেন জানি। চিরকুটের একপাশে তো লাল কালিতে ‘খুন’ লেখা আছে। অপর পাশে লেখা আছে আমার নাম। আর সেই সাথে একটা মেসেজ—‘মৃত্যুর জন্য তৈরি হয়ে যা, ভালোমন্দ যা খাবার খেয়ে নে। আমরা আসছি।’ – আযরাইল
ভয়ের সেই অনুভূতিটা আবার ফিরে এলো আমার মাঝে। আর মনে পড়ল এখন ভাদ্র মাস শুরু হয়েছে। আমাদের বাগানের কোনো গাছেই আম নেই। আম শেষ হয়েছে আরও এক-দেড় মাস আগে। গতকাল বাগানে যাকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখলাম, সে তাহলে আম কুড়াতে আসেনি। হাত-পা অবশ হয়ে গেল আমার! আতঙ্কের ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেলাম। কতক্ষণ এভাবে ছিলাম জানি না। হুশ ফিরল নুহা আর রবিনের চিৎকারে।
‘ভাইয়া, ভাইয়া, জানিস কে যেন আমাদের বাগানের দুইটা লাইট ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে!’
দুই.
প্রান্ত’র কথা:
আমি প্রান্ত। প্রান্ত চাচ্চু। চিনছো আমারে ভাতিজা আর ভাতিজিরা? ঐ যে আমার ভূত দেখাগল্পের সেই প্রান্ত চাচ্চু। খবর পেলাম হাসান নাকি ষোলো ম্যাগাজিনে একটা গোয়েন্দা গল্প লিখে পাঠাচ্ছে। নুহা আমাকে চুরি করে এনে হাসানের গল্প দেখাইছে। হাসান এমনভাবে ঘটনা শুরু করছে, যেন এটা একেবারে রোমহর্ষক টানটান উত্তেজনায় ভরা কোনো গল্প! ছাতার মাথা! আসল কাহিনি ও তোমাদের কখনো বলবে না। তাই আলাদা করে ষোলো সম্পাদকের কাছে লেখা পাঠালাম তোমাদের আসল ঘটনা জানানোর জন্য।
হাসান কিছুদিন আগে শহরে চলে গিয়েছে। আমাদের সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছি যে, গ্রামে থাকলে আর যাই হোক, ও বংশের মানসম্মান রাখবে না। ওর মতো চাপাবাজ আমাদের বংশে কেউ নেই। সম্মিলিত সিদ্ধান্তে তাই ওকে শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। শহরে গিয়েও ওর চাপাবাজি কমবে না এটাও আমরা জানি। কিন্তু শহরের লোকেরা তো আর আমাদের চেনে না। সরাসরি আমাদের বদনাম হবে না।
বেশ কিছুদিন পর হাসান বেড়াতে এসেছে শহর থেকে। সঙ্গে দুইজন বন্ধু এসেছে, যাবির আর রাফি। ওরা শহরেই বড় হয়েছে। কোনোদিন গ্রাম দেখেনি। ৪/৫ দিন থাকবে বলে এসেছিল। কিন্তু এসে আটকা পড়ে গেছে। ওরা যেদিন চলে যাবে ভেবেছিল, সেদিনিই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হঠাৎ করে অন্যদিকে মোড় নিয়ে নিল। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাইদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলো ওইদিন। যানবাহন চলাচল বন্ধ। পরদিন, তারপরের দিন আরও অনেক ছাত্র-জনতা খুন হলো। এরপর তো কারফিউ। ইন্টারনেট বন্ধ। গ্রামের উপর এসবের ঝড়ঝাপটা তখনো তেমন না পড়লেও, ওরা আর শহরে যেতে পারল না।
দুপুরে খাবার পর আমরা আমবাগানে দড়ির খাটে শুয়ে গল্প করছিলাম। যাবির আর রাফি যে উচ্ছ্বাস নিয়ে গ্রামে এসেছিল, তা মিইয়ে যেতে সময় লাগল না। দোষ আসলে গ্রামের না। দোষ আসলে হাসানের। সে এমন এমন চাপাবাজি করেছে ওদের সাথে, ওরা মনে করেছে গ্রাম মানে একেবারেই বেহেশত। গ্রামের মানুষ খুব সহজ সরল। এখনো লাল মাটির পথে গরুর গাড়ি চলে। এখনো সবাই পুকুরে গোসল করে। ওরা ভুলেও ভাবেনি গ্রামের তেমন কেউ আর পুকুরে গোসল করে না। প্রায় সব পুকুরে মাছ চাষ করে। পুকুরে ব্রয়লার মুরগির হাগু মাছের খাবার হিসেবে দেয় অনেকে। আর আমাদের গ্রামে নদী আছে বটে। তবে ভারতের বাঁধের কারণে পানি থাকে না বছরের বেশিরভাগ সময়।
‘হাসান বলল, এই নদীতে নাকি জাহাজ চলে! আপনাদের নিজেদের নাকি একটা জাহাজ আছে। আর আপনি নাকি এত্ত বড় একটা বোয়াল মাছ ধরেছেন কিছুদিন আগে এখান থেকে। আপনি আর হাসান নাকি প্রতিদিন তালপুকুরে গোসল করেন, সাঁতার প্রতিযোগিতা করেন, হাসান নাকি পানির পোকার মতো সাঁতার কাটতে পারে… এখন আপনি এসব কী বলছেন, চাচ্চু!’ অবিশ্বাস ভরা মুখ নিয়ে আমার দিকে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল রাফি!
আমি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হাসানের দিকে তাকালাম। সে ব্যাটা দেখি ঘুমের ভান ধরে মটকা মেরে পড়ে আছে। কিন্তু আমি শিউর সে জেগে জেগে সব শুনেছে।
পরের দিন ঠিক হলো আমরা তালপুকুরে সবাই মিলে গোসল করতে যাব। তালপুকুর নামের এক বিরাট ইতিহাস আছে। সে নিয়ে অন্যদিন গল্প করব। তবে এই পুকুরকে কেন্দ্র করেই আমাদের গ্রামের বিস্তার। পুকুরের পূর্ব দিকে গ্রামের মেইনরোড, বাজার, উত্তর, দক্ষিণ আর পশ্চিম দিকে যথাক্রমে উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমপাড়া। বাজার থেকে গ্রামের যেকোনো দিকে যেতে হলেই তালপুকুরের পাশ দিয়ে যেতে হবে। একসময় এই পুকুরের পানি অনেক ভালো ছিল। আমরা সাঁতারও শিখেছি এখানে। আগে মানুষ এই পানি খেতও। কিন্তু বছর দশেক যাবৎ পুকুরে আর তেমন কেউ আসে না। মাছ চাষ করে গ্রামের চেয়ারম্যান। রাফি আর যাবিরের চাপাচাপিতে এই ময়লা পানির পুকুরেই নামার সিদ্ধান্ত নিতে হলো আমাদের। ওরা জীবনে পুকুরে গোসল করেনি। পুকুরে গোসল করবে!
দুপুর বারোটার দিকে আমরা সবাই পানিতে নামলাম। হাসান দেখি আর নামে না। পানিতে পা ডুবিয়ে সে পুকুরের ঘাটে বসে আছে। কিন্তু পানিতে আর নামে না। তার নাকি এই নোংরা পানিতে নামতে ইচ্ছা করছে না। নামলে চুলকানি হবে, খোসপাঁচড়া হবে, এই সেই বলে যাচ্ছে…।
তোমরা হাসানের কথা শুনে ভাবছো – হ্যাঁ, ও তো ঠিকই বলেছে। এই পানিতে নামলে খোসপাঁচড়া তো হতেই পারে। কিন্তু আমি আসলে জানি হাসান চুলকানির ভয়ে নামছে না - এটা ডাহা মিথ্যা। ও আসলে সাঁতারই কাটতে পারে না। শহরের বন্ধুদের কাছে সেই গুল মেরেছে। এখন জায়গামতো এসে ধরা খেয়েছে। ছোট থাকতে ওকে অনেক সাঁতার শেখানোর চেষ্টা করেছিল নাহিদ ভাই। কিন্তু ও একটা ভীতুর ডিম। ও পানিতেই নামতে চাইত না। পানিতে নামলে ওর অদ্ভুত অদ্ভুত কথা মনে হয়। সাপে নাকি কামড় দিবে, নাক দিয়ে কান দিয়ে পানি ঢুকে যাবে, জিনে নাকি ওর পা টেনে ধরবে। পরীদের রাজ্যে নিয়ে যাবে… ।
ভাতিজা, তুমি বহুত চাপাবাজি করছ, আজকে তোমার বন্ধুদের সামনে তোমার সব জারিজুরি ফাঁস করে দেব। ওকে কীভাবে যে পানিতে নামানো যায় ভাবছি…। এমন সময় হঠাৎ অনেক জোরে শব্দ শুনলাম আর পানি ছিটকে যেতে দেখলাম। এরপর দেখি হাসান আর শাহরিয়ার পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। শাহরিয়ার হাসানের ফুপাতো ভাই। পাশের গ্রামেই ওদের বাড়ি। এতদিন সে বাড়িতে ছিল না। চাচার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। বাসায় ফিরে শহর থেকে হাসান ভাই এসেছে জানামাত্রই আমাদের এখানে চলে এসেছে। বাড়িতে এসে শোনে আমরা সবাই গোসল করছি তালপুকুরে। সে কোনোমতে জামাকাপড় পালটে এক দৌড় দিয়ে আশেপাশে কোনো কিছু না দেখে ঝাপ মেরেছে পুকুরে। ঘাটে যে হাসান বসে আছে খেয়াল করেনি। ঝাপ দেবার আগে ওর সাথে জোড় লেগে ওকে নিয়েই পানিতে পড়েছে।
এরপর তোমরা ভাবছো, হাসান পানিতে পড়ে অনেক নাকানিচুবানি খেয়েছে, পানি খেয়ে পেট ঢোল হয়ে গিয়েছে, সবাই মিলে তাকে আমরা পঁচিয়েছি, তাই না?
না, এরপর এমন কিছু হয়েছে যা তোমরা ভাবতে পারছো না, ভাতিজা আর ভাতিজিরা।
আমরাও ভাবতে পারিনি!
(চলবে ইনশাআল্লাহ... )
১. ধারাবাহিক এই গল্পের প্রথম পর্ব পড়ে নাও এখান থেকে - https://sholo.org/amar-bhoot-dekha