দু’দিন ধরে ওরা চারজন একসাথে বসছে স্কুলের পর। টিমের ডিসিশন, মাসনুনের জন্য কিছু করব আমরা। আজ দেখা গেল অরণ্যও আসছে, মুখ কাঁচুমাচু। ওকে দেখেই আরিফ বিড়বিড় করে কী যেন বলল। ‘ভিতুর ডিম’ কথাটা শোনা গেল শুধু। সেদিন অরণ্য ভয় পেয়ে চলে যাওয়ায় মনে হয় আরিফের মেজাজ খারাপ হয়েছে। 

আরিফের আবার সাহস বেশি। সব কিছুতে মার-মার কাট-কাট। এরকম করলে চলে নাকি! আবিদের বাবার কথা মনে পড়ে। ওর বাবাও এমন ছিল। বছরখানেক আগে এক আন্দোলনে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগে তার। তারপর বেশিদিন বাঁচেননি। বাবার কথা মনে পড়তেই মনটা খারাপ হয়ে যায়, কী দরকার ছিল এত আন্দোলন করার! তবে আন্দোলনে কাজ হয়েছিল। ওদের বইয়ের বিচ্ছিরি শরিফ-শরিফার গল্পটা সরকার বাদ দিয়েছে এর পর। 

হঠাৎ অরণ্যর কথায় চিন্তা ভাঙ্গে তার।

- আসসালামু আলাইকুম, তোরা নাকি কী প্ল্যান করছিস?

- হ্যাঁ, তুই তো সেদিন চলে গেলি।

- হুম, একটু ভয়ই পেয়েছিলাম। ওরা তো খারাপ ছেলেপেলে।

- এখন আসলি যে? কী করবি?

- মাসনুনটার জন্য খারাপ লাগছে, তাই আসলাম। কিছু তো করা দরকার। তো, কী প্ল্যান করলি তোরা?

একটা পৃষ্ঠা বের করল নাবিল। উপরে বড় বড় করে লেখা ‘মাসনুন রেস্কিউ প্ল্যান’। বাকি পুরো পৃষ্ঠা খালি। 

“এই আমাদের প্ল্যান,” দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাবিল।

সবাই চুপচাপ আরও কিছুক্ষণ বসে থাকল। নীরবতা ভেঙে আরিফ বলল, “মাসনুনটা থাকলে হয়তো বলত, ‘চুলকাইতে চুলকাইতে তোরা মাথা ফুটা করে ফেলছিস’।” হাসতে হাসতে সবাই কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খেল। মাসনুনটা হাসাতে পারে বেশ। ওর কথা মনে পড়ায় আবার সবার মন খারাপ হয়ে গেল।

“বেশি মন খারাপ করে আমাদের মাথা হ্যাং হয়ে গেছে মনে হয়। আজকে আর চিন্তা বাদ দিই। বিকেলে চল সবাই একটু মাঠে খেলি আজ। সবাই একটু চিন্তা করে আসবি, যার মাথায় যা আসে। খেলার পর সময় থাকলে আবার বসব।” আবিদ এই বলে সেদিনের মতো মিটিং শেষ করে দিল।

শুক্রবার বিকেলে জমজমাট থাকে মাঠ। স্কুল নেই, তাই অনেকেই আসে খেলতে। আবার অনেকে এমনিতে ঘুরতেও আসে।

আজকের খেলাটাও জমেছে বেশ। ২-৩ গোলে পিছিয়ে আছে আরিফদের দল - আরিফ, নাবিল, আর দুজন ছেলে। অপর টিমে আছে আবিদ, অরণ্য আর সবুজ ভাই। 

সবুজ ভাই ভালোই খেলেন, তবে অরণ্যটা একটু দুর্বল। শেষ মুহূর্তে আরও ২ গোল দিয়ে তাই জিতে গেল আরিফরা। ওদের খুশি দেখে কে! লাফাতে লাফাতে ওরা চিৎকার করতে থাকে, “হারসে!, হারসে!” সবুজ ভাই লজ্জা ঢাকতে বললেন, “ঠি-ঠিক আছে, ঠিক আছে। এখন সবার জন্য ঝালমুড়ি, আ-আমি খাওয়াচ্ছি। যাও, হু।” সবুজ ভাইকে হারতে দেখলেই ঝালমুড়ি মামার মুখ তাই হাসি হাসি থাকে।

খেলা শেষে আবার সবাই গোল হয়ে বসল মাঠে।

“মাগরিবের তো আরও কিছু সময় আছে, তোমরা কিছু ভাবছো?” বলল নাবিল।

“আমার মাথায় কিছু আইডিয়া আসছে,” আরিফ বলল।

নাবিল: কী আইডিয়া?

আরিফ: আমরা ১০-১২ জন মিলে ওদের একদিন ধাওয়া দিই?

আবিদ: চলবে না মনে হয়।

আরিফ: ওদের পানির বোতলে মরিচ মিশিয়ে রাখি?

নাবিল: বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে যায়! তারচেয়ে বরং ওদের বাবাদের বিচার দিই?

আবিদ: ওদের বাবারাও শুনেছি ঘুষখোর টাইপ, কিছু কাজ হবে না মনে হয়।

আরিফ: এবার পেয়েছি! ওদের গায়ে ময়লা পানি ঢেলে দিব! 

আবিদ: কি বলিস! তাহলে ওরা আরও রেগে যাবে। উফ! কিছুই মাথায় আসছে না আর। অরণ্য কিছু বলছিস না যে?

আরিফ: ও আর কী বলবে? ওর তো ওদের দেখলেই প্যান্ট ভিজে যায়।

আবিদ: ছি, আরিফ! এভাবে বলিস না। সবার মতামতই ইম্পর্টেন্ট।

অরণ্য: আমার মাথায় একটা চিন্তা আছে, তবে কালকে বলব। আরেকটু ভেবে দেখি। 

আরিফ: বলেছিলাম না? হুহ!

আবিদ: যাক, কিছু আইডিয়া তো পাওয়া গেল। এগুলো আরেকটু চিন্তা কর তোরা।

ওরা আরও কিছুক্ষণ আগডুম-বাগডুম আইডিয়া চিন্তা করল। কিন্তু কোনো কাজের প্ল্যান করতে পারল না। এরই মধ্যে মাগরিবের আযান হওয়ায় সবাই নামায পড়ে বাসায় চলে গেল। 

পরদিন আবার সবাই এক হলো টিফিন টাইমের আগেই। আজকে মল্লিক স্যার ক্লাস নিবেন না। প্রক্সি টিচার ছেলেদের জ্বালায় হাফ ক্লাস করিয়েই চলে গেছেন, বেচারা। আরিফের আরও একটা উদ্ভট আইডিয়া শুনতে শুনতে হতাশ হয়ে আবিদ অরণ্যর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই না কী যেন বলতে চেয়েছিলি?”

“হা! হা! ও দিবে আইডিয়া!” আরিফ এখনো ফুল গিয়ারে নিজের সন্দেহ প্রকাশ করে চলছে।

“হ্যাঁ, আমি চিন্তা করেছিলাম কিছু। তেমন ভালো হবে না মনে হয়।”

“আরে, বল না!” নাবিল ওকে একটু সাহস দিল।

“আচ্ছা, শোন,” অরণ্য বলতে শুরু করল। “আমরা তো ভালোই ফুটবল খেলি। ওদের সাথে একটা ম্যাচ করতে পারি না? ওরা হারলে ওই গলি থেকে সরে যাবে, আর কাউকে ডিস্টার্ব করবে না। আর আমরা হারলে এই মাঠে খেলা ছেড়ে দিব! ওদেরকে তো সরাসরি বলা যাবে না, তবে আমরা অন্যভাবে জানাতে পারি।”

শুনে সবাই হা হয়ে গেল। সবাই একমুখে বলতে লাগল, “জোস আইডিয়া!”

পরেরদিন ওরা পুরো এলাকায় পোস্টার লাগাতে গেল। পোস্টারটা আরিফের আইডিয়া। পোস্টারে বড় বড় করে লেখা -

টিম বিচ্ছুর ওপেন চ্যালেঞ্জ

সামনের শুক্রবার খেলার মাঠে ফুটবল ম্যাচ

হারাতে পারলে মাঠ ছেড়ে দিবে

আর হারলে ছাড়বে গলি

একদিন পরেই বিকেলে ঐ বখাটে ছেলেগুলোর ৪-৫ জন মাঠে আসে। দিনটা বুধবার।

“ঐ পোস্টারগুলো কি তোরা লাগাইছিস?” বলল ওদের শান্ডা গোছের একজন।

“হুম, খেললে আসো।” সামনে এগিয়ে উত্তর দিল আবিদ। আশ্চর্য ওর একটুও ভয় লাগছে না! নাবিল ওকে বলেছিল, “ভালো কাজে আল্লাহর সাহায্য আসে, অন্তরে স্থিরতা দিয়ে দেন তিনি।”

“ভাই, ওদের এখানেই ফালাইয়া মাইর দিই,” পাশে থেকে ফ্যাচফ্যাচে কণ্ঠে একটা চামচা টাইপ ছেলে বলে উঠল।

“না! ওরা খেলতে চায়, ওদের খেলা দ্যাখায়ে দিব!” এই বলে চলে গেল ওরা।

আলহামদুলিল্লাহ! যাক, খেলতে তো রাজি হয়েছে। কিন্তু সাথেসাথেই সবার ভয় লাগা শুরু করল। এখন আসল জিনিসটা বাকি, খেলা!

শিক্ষা: টিমে সবার মতামত গুরুত্বপূর্ণ, কাউকে ছোট করে দেখা উচিত নয়। সবার উচিত অন্যদের ভালো কাজে সাহায্য করা, উৎসাহ দেওয়া। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন সৎকাজে পরস্পরকে সহায়তা করার। আল্লাহ বলেন, 

“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরের সহযোগিতা করো। মন্দকর্ম ও সীমালঙ্ঘনে পরস্পরের সহযোগিতা কোরো না।” (আল-মায়িদা, ৫ : ৫)