- স্যার, আসতে পারি?

- আসেন।

ঘড়ি দেখলাম, বাজে ৩:১৩। ক্যাজুয়ালিটির নাইটগুলো এমনই হয়ে থাকে—নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত কোনো রোগী নেই, এরপর যখন আসা শুরু হয়, তখন বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো আসতেই থাকে। 

আগন্তুকের প্রাণবন্ত চেহারার সাথে সম্পূর্ণ বেমানান একজোড়া শীতল চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

- রোগী কি ওটি-তে?

- না স্যার, হেরে বাইরে রাইখা আইছি।

- আচ্ছা, চলেন।

বাইরে ভিজিটরদের চেয়ারে শুয়ে থাকা রোগীর চেহারার কয়েক জায়গায় ফুলে নীল হয়ে আছে; থেতলে যাওয়া বাম ভ্রু থেকে একটা রক্তের ধারা চেয়ারে এসে পড়ছে।

- মাথায় কি কোথাও আঘাত আছে?

- না স্যার।

- শরীরের আর কোথাও আঘাত আছে?

রোগী নিজেই বাম হাত দেখালো। পুরো হাত জুড়ে ঘসে যাওয়া সমান্তরাল দাগ, মনে হচ্ছে পিচঢালা রাস্তায় হাতে ঘসা লেগেছে। “হাতটা নাড়ান দেখি। ব্যথা আছে না?” কবজি আর কনুই ধরে নাড়ানোর সময় জিজ্ঞেস করলাম। 

- ব্যথা নাই স্যার, কিন্তু অনেক জ্বলে। 

ওটি মামা (কর্মচারী) আর নার্সদের কোথাও দেখা যাচ্ছে না। “আপনাদের কাগজ কই?” রোগীর লোককে জিজ্ঞেস করলাম। 

- এই তো, স্যার। 

- রোগীকে ওয়ার্ডে ভর্তি করাবেন না?

- না স্যার। 

- আচ্ছা ধরেন ওনাকে, ওটি রুমে নিতে হবে। ওয়ার্ডে ভর্তি না করিয়ে এত রাতে যাবেন কই? 

- বাসা কাছেই স্যার, বাখরাবাদ। নিচে অটো রাইখা আইছি। 

- ওষুধপত্র-দেখাশোনা নিজেরা করতে পারবেন?

- জি, স্যার। 

ওটি বেডে শোয়ানোর পর দেখলাম রোগীর পালস খুব দুর্বল। হাত-পা একেবারে ঠান্ডা। অথচ রোগী সচেতন, এমনকি স্বাভাবিকভাবেই কথা বলছে। GCS (Glasgow Coma Scale; রোগীর সচেতনতা মাপার স্কেল) হিসেবে তো রোগীর এমন হওয়ার কথা না! চোখ পরীক্ষা করলাম। আশ্চর্য এক শীতল চাহনি ছাড়া বাকি কিছুই অ্যাবনরমাল মনে হলো না। 

তবুও একটা নরমাল স্যালাইন চালিয়ে দিলাম। মুখে পভিডন দেওয়ার সময় মনে হলো না রোগীর কাটা-ছেড়ার জায়গায় তেমন যন্ত্রণা হচ্ছে। অথচ এমন অবস্থায় রোগীর যন্ত্রণায় চিৎকার করার কথা। কাটাটাও সেলাই করে দিলাম। হাতেও পভিডন ওয়াশ দিয়ে ময়লা না হওয়ার জন্য ড্রেসিং করে দিলাম। 

হাতের কাজ করতে করতে রোগীর কাছ থেকে জানলাম ঘটনাটা।

২৫ বছর বয়সী মিরাজ, মানে রোগী, এবং তার সমবয়সী বন্ধু আবিদ; দু’জনেই একটি ওয়ার্কশপে কাজ করে। একই মেসে থাকে ওরা দু’জন। কাজ শেষে তারা বাসায় ফিরছিল। ঠিক সেই সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে একটি গাড়ি এসে ধাক্কা মেরে চলে যায়।

এরপর মিরাজ চোখ খুলে দেখে, সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। কিন্তু মাঝের সময়টায় কী ঘটেছে তা বলার মতো আবিদ উপস্থিত নেই। কারণ, হাতের কাজ শুরু করার পরই লক্ষ্য করলাম, রোগীর সাথে যে এসেছিল সে পাশে নেই। 

কাজ শেষ করতেই দেখি আবিদ ওটি-র দরজা দিয়ে রুমে প্রবেশ করছে। মুখে একরকম অস্বস্তিকর হাসি। 

মিরাজকে শুয়ে থাকতে আর আবিদকে আমার সাথে আসতে বলে অফিসে চলে আসলাম। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন দেখলাম আবিদ রুমে আসছে না, তখন কাগজে ওষুধপত্র লিখতে থাকলাম। “আশ্চর্য লোক তো! এখনো আসছে না!” বিরক্ত হয়ে ওষুধপত্র নিয়ে ওটি-তে গিয়ে দেখি বিছানা খালি, রুমে কেউ নেই। বেডের পাশের স্ট্যান্ডে ঝুলানো স্যালাইনের ব্যাগ থেকে স্যালাইন পড়ে বেড ভিজে যাচ্ছে। অফিসে ফেরার পথে ওয়ার্ড আর নার্স ষ্টেশনেও পেলাম না অদ্ভুত আগন্তুকদের। যেন হাওয়ায় মিশে গেছে ওরা। বিরক্ত মুখে অফিসে বসতেই পরের রোগী চলে এলো। 

ডিউটি শেষে ব্যাগ গোছাচ্ছি এই সময় নার্স এসে বলল, “চলে যাচ্ছেন, স্যার? জলদি ফিমেইল ওয়ার্ডে আসেন।” 

গিয়ে দেখলাম গতকাল সন্ধ্যায় ভর্তি হওয়া এক রোগী মারা গেছে। পাশেই ওনার এটেন্ডেন্ট কান্না করছে। অস্বাভাবিক কিছু দেখা যাচ্ছে না। চলে যাব এমন সময় হঠাৎ খেয়াল করলাম রোগীর আঙুলগুলো অস্বাভাবিকভাবে বাঁকানো। মুখও খেয়াল করে দেখলাম লাল হয়ে আছে। নার্সের কাছ থেকে গ্লাভস নিয়ে মু্খের আর নাকের ভেতরটা দেখলাম। যা সন্দেহ করেছি তাই। মুখের আর নাকের ভেতরে জমাট রক্ত। বাইরেও বের হওয়ার কথা, কেউ হয়তো মুছে নিয়েছে। শ্বাসরুদ্ধ করে রোগীকে হত্যা করা হয়েছে। মুখে বা গলায় কোনো দাগ নেই। তার মানে বালিশ বা নরম কিছু দিয়ে নাক-মুখ চেপে ধরছিল কেউ। 

কাউকে কিছু না বলে অফিসে এসে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে দেখতে পুলিশকে কল দিচ্ছি। এই সময় একটা ফুটেজ দেখে হঠাৎ মনে হলো জমে গেলাম, শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। ফুটেজটা ফিমেইল ওয়ার্ডের না, ওটি রুমের। সময় ৩:২০। দেখি ওটি রুমে আমি একা একটা বেডের পাশে কাজ করে যাচ্ছি। কোথাও কেউ নেই…