ক্যান্সার একটি প্রাণঘাতী রোগ। আল্লাহর রহমাহ এবং তীব্র মানসিক শক্তি না থাকলে ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে বেঁচে ফেরা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আমরা কি জানি, হাতে গোনা কিছু প্রজাতির প্রাণী এই দিক থেকে এতই ভাগ্যবান যে, জীবদ্দশায় তাদের ক্যান্সারই হয় না?
আমাদের এই পৃথিবীতে বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রাণী রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে আকার-আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যগত বৈচিত্র্য। কেউ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট, কেউবা কয়েকশ মিটারের চেয়েও বড়। তেমনই এক বৈচিত্র্যময় বৃহদাকার প্রাণী তিমি, যার কখনো ক্যান্সার হয় না।
তিমির শরীরে মানুষের শরীরের চেয়ে কয়েকশ বিলিয়নেরও বেশি কোষ আছে। সুতরাং, তাদের DNA[১]-তে ক্ষতিকারক মিউটেশন[২] বিকাশের সুযোগ আরও বেশি। সাধারণত, ক্যান্সার হয় যখন অস্বাভাবিক কোষ বিভাজন ঘটে। কোষ বিভাজনে যখন কোনো সমস্যা হয়, তখন কোষ বেশিরভাগ সময় নিজেই সমাধান প্রক্রিয়া বের করে তার সমাধান করে। যখন সমাধান করতে ব্যর্থ হয় তখন ক্যান্সার কোষের সৃষ্টি হয়।
কোষ বিভাজনের মাধ্যমেই প্রাণীর দৈহিক বৃদ্ধি ঘটে। প্রাণী যত বাঁচে, তার মধ্যে তত কোষ বিভাজন হয়, শরীরে কোষের সংখ্যাও তত বাড়ে। ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে। তিমি (Bowhead Whale) স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাঁচে এবং তাদের শরীরে কোষের সংখ্যাও অনেক বেশি। সুতরাং, তাদের শরীরে কোষ বিভাজন বেশি হয় এবং ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকার কথা। কিন্তু সেই তিমির ক্যান্সার হয় না! বা ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি খুবই কম। এটাকে অনেক সময় “Peto's paradox”-ও বলা হয়।[৩]
বিজ্ঞানী মার্ক টলিস এই বিষয়টি নিয়ে অনেক গবেষণা করেছেন। তার দল মূলত তিমি মাছের DNA নিয়ে গবেষণা করেছে। তারা অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সাথে তিমির DNA তুলনা করে দেখতে পেলেন, তাদের DNA-তে কিছু মিল-অমিল রয়েছে। তিমির DNA-তে এমন কিছু অংশ আছে যা অন্যান্য প্রাণী থেকে দ্রুততর কোষ চক্র, কোষ বিভাজন ও DNA পুনর্গঠন নিয়ন্ত্রণ করে, যা সাধারণ কোষ কার্যক্রমের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তাছাড়া তিমির DNA-তে টিউমার ও ক্যান্সাররোধী অনেকগুলো জিন রয়েছে, যা তিমিকে ক্যান্সার থেকে রক্ষা করে এবং ক্যান্সার কোষ বিকাশ প্রতিরোধ করে।[৪] তিমির কোষের এই ব্যতিক্রমী কিছু বৈশিষ্ট্যই তাকে ক্যান্সারের হাত থেকে রক্ষা করে। এই কারণে তিমির ক্যান্সার হয় না!
রেফারেন্স:
১. প্রাণীর বংশগতির ধারক ও বাহক হলো কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত ক্রোমোজোম। এই ক্রোমোজোম সাধারণত DNA ও হিস্টোন নামক এক ধরনের প্রোটিন নিয়ে গঠিত। DNA এক ধরনের যৌগ, যা দেখতে পেঁচানো সিড়ির মতো। এই DNA-তে প্রাণীর সকল বৈশিষ্ট্য জেনেটিক কোড আকারে সংরক্ষিত থাকে।
২. DNA-এর জেনেটিক কোডে কোনো পরিবর্তন হলে প্রাণীর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে যায় বা নতুন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। DNA-তে এমন স্থায়ী পরিবর্তনকে মিউটেশন বলে। মিউটেশনের ফলে প্রকাশিত বৈশিষ্ট্য প্রাণীর জন্য উপকারী, ক্ষতিকর, কিংবা নিরপেক্ষ হতে পারে।
৩. Tollis, M., Boddy, A. M., & Maley, C. C. (2017). Peto’s Paradox: how has evolution solved the problem of cancer prevention? BMC Biology, 15(1). https://doi.org/10.1186/s12915-017-0401-7
৪. Tollis, M., et al. (2019). Return to the Sea, Get Huge, Beat Cancer: An Analysis of Cetacean Genomes Including an Assembly for the Humpback Whale (Megaptera novaeangliae). Molecular Biology and Evolution, 36(8), 1746–1763. https://doi.org/10.1093/molbev/msz099